১।
শুক্রবার দুপুরে শিশুমেলার কাছে রাস্তা পার হওয়ার সময় থমকে দাঁড়াতে হল। ডিভাইডারের উপরে নোংরায় মাখামাখি হয়ে একটা বাচ্চা ছেলে পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছিল মৃত! কত হবে বয়স? ১২ বা ১৩! শরীরে হাড় আর চামড়া ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই। কি হয়েছিল ছেলেটার? চুরি করতে গিয়ে মার খেয়েছে? কিন্তু তাহলে তো এতক্ষণে পুলিশের নিয়ে যাওয়ার কথা! কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে না বেশিক্ষণ থাকবে।
শত শত লোক পার হয়ে যাচ্ছে। জুম্মার নামাজে যাচ্ছে অনেকেই। কিন্তু ফিরেও তাকাচ্ছে না কেউ! এমন নোংরার দিকে তাকলেও সম্ভবত ওযু ভেঙ্গে যাবে। তাই সবাই অন্যদিকে ফিরে জায়গাটা পেরিয়ে যাচ্ছে। বেহেস্তের রাস্তা পরিষ্কার করতে হবে তো!
কেন যেন পারলাম না এড়িয়ে চলে যেতে। ধরে ধরে রাস্তার পাশে নিয়ে বসালাম। এমন পরিস্থিতিতে কি করতে হয় জানা নেই। হেঁটে যাওয়া মানুষদের দৃষ্টি দেখে মনে হল আমাকে এখুনি কোন মানসিক হাসপাতালে পাঠানো দরকার। একটা চা-এর দোকান খোলা পেয়ে সেখান থেকে একটা রুটি আর কলা কিনে নিলাম। সাথে এক বোতল পানি। ১০মিনিট পরে মনে হল এযাত্রা বেঁচে যাবে ছেলেটা। কেমন যেন অবাক একটা চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। আর কি ছিল সেই চোখে? ঘৃণা? এই নষ্ট হয়ে যাওয়া সমাজের প্রতি? সেই দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ বশে থাকা সম্ভব ছিল না। আরও কিছু বিস্কিট কিনে দিয়ে চলে আসলাম। জানিনা ছেলেটার শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল।
আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কেন যেন সেই অদ্ভুত দৃষ্টিটা ভুলতে পারি না। দম বন্ধ মনে হয়। কিছু একটা করার জন্য হাসফাস করি।
শিশুদের নিয়ে কাজ করছে এমন কিছু এনজিওর সাইটে ঢুঁ মারি। মাত্র ২০০০ টাকা লাগে একটা ছোট বাচ্চাকে স্পন্সর করতে [১, ২, ৩]!! অবাক হয়ে ভাবি আর কতদিন লাগবে পথ-শিশু শব্দটাকে অভিধান থেকে বাদ দিতে?
২।
পৃথিবীর সবচেয়ে নাজুক ধর্মানুভূতি সম্ভবত মুসলমানদের। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে কেউ হাঁচি দিলেও আমাদের ধর্মানুভূতি আহত হয়।
টিভির খবরে দেখি দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক বলছেন যে “ইনোসেন্ট মুসলিম” ভিডিওটা না সরানো পর্যন্ত ইউটিউব বাংলাদেশে বন্ধ থাকবে [৪]। পর্দার নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই ইনি আমাদের বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান। উনার কথাবার্তা আর জ্ঞানের বহর দেখে অবাক হই। নীতি নির্ধারকদের এই অবস্থা হলে তাঁদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো কিছু আর আশা করা যায় না। রাস্তায় লাঠি নিয়ে হাঙ্গামা করা মাদ্রাসার ছাত্রদের সাথে উনার একমাত্র পার্থক্য সম্ভবত এই যে উনার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আছে।
নিজের ভেতরে শুধুই হতাশা বাড়তে থাকে।
৩।
হঠাৎ করেই শুনতে পাই রামুতে বৌদ্ধদের উপরে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি, মন্দির সব জ্বালিয়ে দিচ্ছে কিছু ধর্মান্ধ উন্মাদ! খবরের কাগজ আর টিভির রিপোর্ট দেখে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। কি হচ্ছে আমাদের দেশে? কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। খবরে জানা যায় এই হামলা নাকি পূর্বপরিকল্পিত! ভাবি কি দরকার আমাদের ট্যাক্সের টাকায় এত এত গোয়েন্দা বাহিনী পুষে রাখার?
জানি কিছুই হবে না। আমরা নিউজ চ্যানেল পাল্টে টি২০-এর স্কোর দেখি। মা**** পাকিস্তানিদের ছক্কা হাঁকানো দেখে খুশি হয়ে উঠি। আমরা সভ্য মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হলে কিছু অতীত তো বিসর্জন দিতেই হবে তাই না [৫]!
৪।
চট্টগ্রামে হাসপাতালের পাঁচ তলা থেকে রোগীর আত্মীয়কে ফেলে দেয় কর্মচারীরা [৬]। অবাক হই না আর। বুঝে যাই সভ্য মানুষ হতে হলে চোখ বন্ধ করে বাঁচতে শিখতে হবে।
কিছুই ভালো লাগে না। চারিদিক ধূসর মনে হয়। এতেই অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি। শুধু মাঝে মাঝে খুব দমবন্ধ লাগে। মনে হয় একটু যদি সত্যিকারের মানুষের মত খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারতাম!! অন্তত একটি বার।
Leave a Reply