একটি মৃত আত্মা

অফিস থেকে ফিরছিলাম। রোজকার মতই চরম বিরক্তি আর ক্লান্তি নিয়ে। বাস থেকে নেমে কোন রিকশা পাওয়া যায় না। হেঁটেই বাসা পর্যন্ত আসছিলাম। অন্ধকার, ভাঙ্গা ফুটপাথ মাড়িয়ে। হাঁটার ক্লান্তি দূর করার জন্য নিজের মধ্যেই মগ্ন হয়ে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সামনে কি যেন পড়ায় থমকে দাঁড়াতে হল। সেই ভাঙ্গা ফুটপাথের অন্ধকারেই একটা মানুষ। প্রায় উলংগ। শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে?

বাস গুলো রাস্তায় পার্ক করা শুরু করার পর থেকে এই ফুটপাথটা খারাপ হয়ে গেছে। নেশাখোরদের আখড়া হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই তেমন কেউ। মাত্রাতিরিক্ত নেশা করে বেহুঁশ হয়ে আছে। আমাদের এই ঘুনে ধরা দেশে এইসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছুই নেই। পড়ে আছে, সকালে উঠে চলে যাবে। পড়ে থাকা শরীরটা ডিঙ্গিয়ে চলে আসলাম। কিন্তু তবুও কেন যেন মনে হল, মরে গেছে মানুষটা।

একবার ভাবলাম পুলিশ কে একটা ফোন করে দিলেই তো হয়। ওরাই যা করার করবে। তবু কেন যেন করলাম না।

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় একই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম লোকটাকে। তখনও ফোন করলাম না। কেন করলাম না? দায়িত্ব থেকে পালিয়ে গেলাম??

সত্যিই কি পালিয়ে যেতে পেরেছিলাম? সারাদিনই মনের মধ্যে একটা কিসের যেন খোঁচা লাগছিল! সন্ধ্যায় ফেরার পথে আবারও বাঁধা। এবার তার পাশে কয়েকজন পুলিশও আছে। জিজ্ঞেশ করে জানতে পারলাম, বেওয়ারিশ লাশ, তাই আঞ্জুমানের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। কেমন যেন একটা কষ্টবোধ ভেতরে। কেন কালই কোন ব্যবস্থা নিলাম না? তাহলে হয়ত মৃত মানুষটাকে দুইটা দিন রাস্তায় পড়ে থাকতে হত না।

আচ্ছা, এই মানুষটার জন্মের সময় কেউ কি ভাবতে পেরেছিল তার এমন পরিণতি হবে? তার মা হয়ত কত আদরেই না আগলে রাখত ছোট্ট বাচ্চাটাকে। তার জীবনের এত গুলো বছরে সে নিজে কি কখনো ভেবেছিল? আচ্ছা, কার উপর তার এত অভিমান ছিল যে নেশার হাতে নিজেকে সপে দিয়ে জীবনের এমন পরিণতি টেনে আনল? কিসের এত অভিমান ছিল তার?

তাকে যদি ঈশ্বর জিজ্ঞেশ করে কার প্রতি তোমার এত অভিমান? সেই তালিকায় আমার নামটাও কি থাকবে না? হয়ত সর্বশেষ নামটা হবে আমার। সে হয়ত অভিমান করে বলবে, সেদিন সন্ধ্যায়ই যদি কোন ব্যবস্থা নিতাম, তাহলে তার মৃতদেহটা নর্দমার পাশে দুই দিন পরে থাকত না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *